কিছুদিন এমনভাবে চললে এমনেই না খাইয়া মইরা যামু

ঢাকা, ০৩ মে- ক্ষুধার জ্বালায় ভিক্ষায় নেমেছেন শেফালি বেগম। করোনাভাইরাস প্রভাব শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতেন, ফুট-ফরমাশ খাটতেন বিভিন্ন অফিসে। কিন্তু এখন সব বন্ধ। কয়েক দিন ধরে পেটে তেমন কিছুই পড়েনি। শেষমেশ না খেতে পেয়েই না মৃত্যু...

কিছুদিন এমনভাবে চললে এমনেই না খাইয়া মইরা যামু
ঢাকা, ০৩ মে- ক্ষুধার জ্বালায় ভিক্ষায় নেমেছেন শেফালি বেগম। করোনাভাইরাস প্রভাব শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতেন, ফুট-ফরমাশ খাটতেন বিভিন্ন অফিসে। কিন্তু এখন সব বন্ধ। কয়েক দিন ধরে পেটে তেমন কিছুই পড়েনি। শেষমেশ না খেতে পেয়েই না মৃত্যু হয়! বাধ্য হয়ে নেমে পড়েছেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। কিন্তু করোনা আতঙ্কে রাস্তাঘাটে যেমন লোকজন কম, তেমনি বাসাবাড়িতেও কেউ দরজা খোলে না। এভাবে কেমনে বাঁচবেন সেই চিন্তাই শেফালি বেগমদের। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এখন এ রকম অপেশাদার ভিক্ষুকরা পেটের তাগিদে রাস্তায় নেমেছেন। তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো কর্মে ছিলেন। হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়ায় বেকায়দায় পড়েছেন তারা। ঘরে কোনো খাবার নেই। বাসায় ছোট ছোট বাচ্চা, অসুস্থ স্বামী কিংবা বাবা-মাকে নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাদের খাবার আর ওষুধের সংস্থান করতেই এখন বাধ্য হয়ে চোখলজ্জা হারিয়ে হাত পাতার মতো পেশায় নামতে হয়েছে। দলবেঁধে একসঙ্গে অভিজাত এলাকায় সাহায্যের জন্য আবেদন করছেন, হাত পাতছেন। কিন্তু করোনা আতঙ্কে কেউ দরজা পর্যন্ত খুলছেন না। রাস্তায় আগের মতো লোকজন না থাকায় সেখানেও তেমন কোনো সাহায্য পাওয়া যায় না বলে জানান শেফালি বেগম। তিনি বলেন, আমাদের করোনাভাইরাসে মরতে অইবো (হবে) না। কিছুদিন এমনভাবে চললে আমরা এমনেই না খাইয়া মইরা যামু। একদিন খালি (শুধু) মুখোশ (মাস্ক) আর হাত ধোয়ার ওষুধ দিয়ে গেছে। পেটে দেওয়ার মতো খাবার তো কেউ দেয় না। ক্ষুধার জ্বালা আর সহ্য হচ্ছে না। নোভেল করোনার প্রকোপে গোটা দেশ যখন ঘরবন্দি, সেই সময়ই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ চিন্তাই এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রান্তিক মানুষদের। অভাবের কারণে ভিক্ষা করতে যে বের হবেন, লকডাউনের জেরে সেই উপায়ও নেই। ভিক্ষা করতে বের হলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আতঙ্কে মানুষ ভিক্ষা না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। করোনার এ পরিস্থিতিতে বন্ধ রয়েছে সব কর্মসংস্থান। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। এমনকি গৃহকর্মী, ভিক্ষুক ও দিনমজুরদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই তাদের ভোগান্তি বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হতে হবে এসব শ্রমিককে। কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়তে হবে প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠীকে। মরণ ভাইরাস নিয়ে যত না আতঙ্কিত এসব মানুষ, তার চেয়ে না খেতে পেয়ে মারা যাওয়ার ভয়ই চেপে ধরেছে তাদের। কারণ, দুর্যোগ ও মহামারি ইত্যাদিতে যারা বেশি বিপদে পড়েন, তারা হলেন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিযুক্ত শ্রমিক। অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধের সময় খেটে খাওয়া মানুষ, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক ও প্রান্তিক কর্মীদের অবস্থাই বেশি শোচনীয় হয়ে ওঠে। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার এলাকার এক সাহায্যপ্রার্থী গোফরান মিয়া বলেন, সন্তান-সন্ততি, বাবা-মা মিলিয়ে তার পরিবারে আটজন সদস্য। কেরানীগঞ্জ স্থানীয় ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। কিন্তু লকডাউনের জেরে এখন হাতে কাজ নেই। বাড়িতে যা মজুদ ছিল, শুরুতে তাই দিয়ে ছেলেমেয়েদের পেট ভরিয়েছেন। কিন্তু এখন আর কিছু নেই। তিন দিন ধরে একবেলা খেয়ে, আধপেট খেয়ে পার করতে হচ্ছে। রহিমা বেগম নামের একজন জানান, ৭২ বছরে স্বামীকে নিয়েই ছিল তার সংসার। মাঝেমধ্যে স্বামী রিকশা চালিয়ে আর নিজে বাসাবাড়িতে কাজ করে কোনো রকম দিন চলছিল। এখন কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। কাঁঠালবাগান এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ওই এলাকার ভোটার না হওয়ায় কোনো সাহায্য করা যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়ে মানুষের কাছে হাত পেতেছেন। এম এন / ০৩ মে