করোনার যে তথ্যগুলো গোপন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

ঢাকা, ০৩ মে - করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেহাল দশা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে সমস্ত তথ্য, উপাত্ত, প্রতিশ্রুতি এবং আশ্বাসগুলো দিচ্ছিল বাস্তবের সাথে তাঁর কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই ধারা এখনো অব্যহত রেখেছে স্বাস্থ্য...

করোনার যে তথ্যগুলো গোপন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
ঢাকা, ০৩ মে - করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেহাল দশা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে সমস্ত তথ্য, উপাত্ত, প্রতিশ্রুতি এবং আশ্বাসগুলো দিচ্ছিল বাস্তবের সাথে তাঁর কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই ধারা এখনো অব্যহত রেখেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যখন করোনার সূত্রপাত হলো, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বললো যে তাঁরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তাঁদের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল করোনার জন্য ডেডিকেটেড রয়েছে। কিন্তু যখন বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হলো তখন দেখা গেল যে, হাসপাতালগুলো অপ্রতুল, হাসপাতালগুলোতে নূন্যতম চিকিৎসার পরিবেশও নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলেছিল যে তাঁরা প্রস্তুত, কিন্তু যখন সংক্রমণ শুরু হলো তখন দেখা গেল যে, চিকিৎসকদের জন্য পিপিই নেই, মাস্ক নিয়ে তো মহা কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। এরকম নানা রকম আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুরু থেকে দিচ্ছে, যার বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায়না। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ বললো যে যারা স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, তাঁদেরকে পাঁচ তারকা মানের হোটেলে রাখা হবে। কিন্তু সেই নির্দেশনার কি হলো তা এখন পর্যন্ত মানুষ জানেনা, সেই তথ্যটিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেয়নি। সবথেকে বড় কথা হচ্ছে যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত বুলেটিন করছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি মিডিয়া উইং তৈরি করা হয়েছে। এরা কেউই যে তথ্যগুলো জানালে দেশের করোনা পরিস্থিতি কতটুকু ভালো বা ভয়াবহ খারাপ বোঝা যেত, সেই তথ্যগুলো দিচ্ছে না। যে তথ্যগুলো পেলে বিশেষজ্ঞরাও বুঝতে পারতেন যে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের হার বা অবস্থা কি এবং কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেরকম তথ্য দেয়া হচ্ছেনা। আসুন দেখে নেই যে তথ্যগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গোপন করছে- প্রথমত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফ্রিংয়ে আজ একলাফে প্রায় সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ১ হাজার বেড়েছে। এর আগে গত শনিবারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে বলেছিল, সুস্থ হয়েছেন ১৭৭ জন। আজ একলাফে ১ হাজার ৬৩জন হয়ে গেল। এর পক্ষে যুক্ত হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন গাইড লাইন অনুযায়ী ১ হাজার ৬৩ জন সুস্থ হয়েছে। গাইডলাইন পরিবর্তন করলে কি সুস্থের লক্ষণ পাল্টে যায়? গাইডলাইন পরিবর্তন করলে কি অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে যায়? এ কি ধরণে তথ্য? এবং এর কোন ব্যাখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন করোনা সংক্রান্ত যে স্বাস্থ্য বুলেটিন দুপুর আড়াইটায় প্রকাশ করা হচ্ছে সেই স্বাস্থ্য বুলেটিনে বলা হচ্ছে যে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় কতজন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মোট আক্রান্ত কতজন, কতজন মারা গেছেন, কতজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু আক্রান্তদের মধ্যে কতজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কতজন বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন- এই তথ্যটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিচ্ছেনা কেন? হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা আমরা যদি জানতে পারি, তাহলে বুঝতে পারবো কতজনের চিকিৎসা হচ্ছে এবং আমাদের চিকিৎসার সক্ষমতা কতটুকু। তৃতীয়ত, যে তথ্যটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিচ্ছেনা তা হলো কোন হাসপাতালে কতজন রোগী আছে। করোনা চিকিৎসায় যে হাসপাতালগুলোর কথা বলা হয়েছে শুরু থেকে, করোনার জন্য ডেডিকেটেড বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো- এর মধ্যে অনেকগুলো হাসপাতাল এখনো প্রস্তুতই হয়নি। কাজেই এই তথ্যটি যদি আমরা পেতাম যে, কোন হাসপাতালে কতজন রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তাহলে আমরা জানতে পারতাম যে কয়টি হাসপাতাল এখন এই মুহুর্তে কাজ করছে। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে এখন লম্বা ফিরিস্তি দেয় যে এতগুলো হাসপাতাল ডেডিকেটেড করা হয়েছে করোনার জন্য, আসলে সেই তথ্যের বাস্তবতা কতটুকু তা বোঝার জন্য কোন হাসপাতালে কতজন রোগী আছে তা জানা অত্যন্ত জরুরী। চতুর্থত, হাসপাতালগুলোতে কতজন ডাক্তার আছেন, কোন ধরণের ডাক্তার আছেন, কতজন নার্স আছেন এবং কতজন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আছেন- এই তথ্যটিও আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বুলেটিন বা অন্য কোথাও পাচ্ছিনা। অথচ করোনা মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি জানার জন্য হাসপাতালের সংখ্যা জানা যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী একটি হাসপাতালে কতজন চিকিৎসক আছেন, কি ধরণের চিকিৎসক আছেন। যেমন হৃদরোগে বা কিডনীর রোগে যারা আক্রান্ত তাঁদের জন্য করোনা অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। কাজেই করোনার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতালে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং একজন কিডনী বিশেষজ্ঞ থাকা দরকার। সেরকম আছে কিনা তা জানা আমাদের দরকার। আমরা দেখেছি যে, প্রতিদিন বলা হচ্ছে যে, প্রতিদিন এতজনের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু করোনা সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান থাকলে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে পোর্টফলিও দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে, যখন একজন মানুষ করোনা পজিটিভ হয়, তারপর ১৪ দিন পরে তাঁর দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় দেখা হয় নেগেটিভ এসেছে কিনা এবং তৃতীয়বারে আরেকবার দেখা হয় এবং সেখানেও যদি নেগেটিভ আসে, তাহলে সেই রোগী করোনা মুক্ত হয়েছে বলে জানা যায়। আমাদেরকে প্রতিদিন যে হাজার পাঁচেক পরীক্ষার তালিকা দেয়া হচ্ছে তাঁর মধ্যে প্রথম দফার পরীক্ষা কতটি, দ্বিতীয় দফার কতটি এবং তৃতীয় দফার কতটি- এই তথ্যটি দেয়া হচ্ছে না। অথচ করোনা পরিস্থিতি জানার জন্য আসলেই প্রথমবার পরীক্ষায় কত জনের পজিটিভ হয়েছে, এই তথ্যটি জানা আমাদের জন্য যেমন দরকারি, তেমনি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বার কয়টি পরীক্ষা হয়েছে সেই তথ্যটি আরো জরুরী। এছাড়াও বলা হচ্ছে যে, করোনার জন্য ৩১ টি ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ল্যাব যুক্ত হচ্ছে বলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বুলেটিনে বলা হচ্ছে। তাহলে কোন ল্যাবে কত পরীক্ষা হছে এই তথ্যটিও আমাদের জানা দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে শুধু জানানো হচ্ছে যে কতজনের পরীক্ষা হচ্ছে, কিন্তু কোন পেশার কতজনের পরীক্ষা হচ্ছে সেই সম্পর্কে কোন তথ্য দেয়া হচ্ছেনা, অথচ এই তথ্যটি অনেক জরুরী। কারণ সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছে যে, করোনার জন্য পরীক্ষা করতে গেলে পরীক্ষা করতে পারছে না। করোনা পরীক্ষায় শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন প্রাধান্য পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন অপেক্ষার পরেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না বলে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। এই তথ্যটাও আমাদের কাছে নেই। করোনা পরীক্ষা করাতে আগ্রহী যারা, তাঁদের কোন তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করেছে বা একটি রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা কি করা হয়েছে? কারণ একজন মানুষ যখন তাঁর মধ্যে উপসর্গ বা সংক্রমণের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করেন, তখনই তিনি যোগাযোগ করেন রক্ত পরীক্ষার জন্য। তাই এসব মানুষের তালিকা তৈরি করাটা একটি জরুরী কাজ, কিন্তু সেরকম তালিকা আদৌ আছে কিনা এবং থাকলে সেই তালিকায় কতজন রয়েছে এরকম তথ্য নেই। আমরা মনে করিনা যে তথ্য গোপন করে বা সবকিছু ঠিক আছে দেখিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা মোকাবেলা করতে পারবে। বরং সত্যকে আলিঙ্গন করে, সত্য তথ্যগুলো সকলের সামনে উপস্থাপন করে সম্বিলিতভাবেই করোনা মোকাবেলা করাটাই হলো আমাদের যৌক্তিক কাজ এবং সেই কাজটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করতে পারছে কিনা তাই নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সুত্র : বাংলা ইনসাইডার এন এ/ ০৩ মে