পাচ শতাধিক খামারির মাথায় ঋনের বোঝা ; পানির দরে দুধ পঞ্চগড়ের দুগ্ধ খামারিদের করুণ দশা

   পাচ শতাধিক খামারির মাথায় ঋনের বোঝা ; পানির দরে দুধ পঞ্চগড়ের দুগ্ধ খামারিদের করুণ দশা

   পাচ শতাধিক খামারির মাথায় ঋনের বোঝা ; পানির দরে দুধ পঞ্চগড়ের দুগ্ধ খামারিদের করুণ দশা

     
 এএনবি পঞ্চগড় প্রতিনিধি ঃ খামারিরা চরম সঙ্কটে পড়েছে ‘ কি হবে এ নিয়ে দিশেহারা। করোনা সংক্রমনরোধে কড়াকড়ি আরোপ করায় বিপাকে পড়েছেন পঞ্চগড়ের এই পাঁচ শতাধিক দুগ্ধ খামারি। মিল্কভিটা খামারিদের দুধ কেনা বন্ধ করে দেয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। ৫০ টাকা লিটারের দুধের বাজার নেমে এসেছে ৩০ টাকা ৩৫ টাকায়। তারপরও বিক্রি হচ্ছে না। দুধ বিক্রি না হওয়ায় স্থানীয়দের বিলিয়ে দিচ্ছেন অনেক খামারি। তবে রমজানের এক মাসে এই দুধ বিক্রি হয়েছে ৫০ /৬০ টাকা। তবে আবার ও নেমে গেছে সেই দাম। ঈদের কদিন আগেও  গরুর দুধ ছিলো ৬০/৮০ টাকা।  চাহিদা না থাকায় সে দাম এখন আর নেই। তবে রমজানের আগে প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ২০। এখন ঈদের আমেজ কিছুটা থাকায় ৩০/৩৫ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে দুধ।এমন পরিস্থিতিতে গরুর খাবার জোগান এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় কাটছে তাদের দিন। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায় গত কয়েক বছরে পঞ্চগড় সদর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরণের প্রায় পাঁচ শতাধিক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠে। এদের অধিকাংশরাই সরকারি বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে খামার গড়ে তোলে। দুটি থেকে শুরু করে ৩০ টি পর্যন্ত শাহীওয়াল ও ফ্রিজিয়ানসহ উন্নত জাতের গাভী রয়েছে এসব খামারে। প্রতিটি গাভী ১০ লিটার থেকে ৩০ লিটার পর্যন্ত দুধ দিয়ে থাকে। এসব দুধ খামারিরা (বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড) মিল্কভিটার পঞ্চগড় কার্যালয়ে সরবরাহ করতো। প্রতি লিটার দুধ ফ্যাট অনুযায়ী ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পেতেন তারা। সব চলছিল ঠিকঠাক মতই। কিন্তু গত ২৬ মার্চ থেকে করোনা পরিস্থিতিতে দুধ কেনা বন্ধ করে দেয় মিল্কভিটা।
 অন্যদিকে হাট বাজারের হোটেলগুলোও প্রশাসনের নির্দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে বিপাকে পড়ে যান এসব দুগ্ধ খামারিরা। প্রতিদিন দুধ দহন করে বিক্রি করতে পারছেন না তারা। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কেউ কেউ ৩০/৩৫টাকা লিটারে অল্প কিছু দুধ বিক্রি করতে পারলেও বাকিটা স্থানীয়দের বিলিয়ে দিচ্ছেন। দুধ বিক্রি না হওয়ায় খামারের গাভীর খাবার জোগান ও ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ নিয়ে গভীর দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন তারা। খামারিরা জানান প্রতিদিন ছোট্ট একটি খামারে গাভীর খাবার ও পরিচর্যা বাবদ তাদের সর্বনি¤œ খরচ হয় ৩/৪ হাজার টাকা। প্রতিদিনের দুধ বিক্রির টাকা থেকেই এই খরচের জোগান হতো। কিন্তু দুধ বিক্রির সুযোগ না পাওয়ায় এখন তাদের পড়তে হয়েছে কঠিন সংকটে। এছাড়া খামারিরা অভিযোগ করেন এই করোনা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাজারে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ গাভীর খাবারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন। দুধ বিক্রির সুযোগসহ খামারিরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন। 

পঞ্চগড় হাফিজাবাদ ইউনিয়নের দুগ্ধ খামারি আল আমিন জুয়েল বলেন, পঞ্চগড়ে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। আমাদের খামারিদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে গাভী কিনে খামার করেছে। আমাদের প্রতিদিন দুধ বিক্রি করেই গাভীর খামার, সংসারের খরচ ও কিস্তির টাকা জোগার করতে হয়। করোনা পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে মিল্কভিটা দুধ কেনা বন্ধ করে দেয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছি আমরা। 
হাফিজাবাদ জিয়াবাড়ি এলাকার খামারি খোরশেদ আলম বলেন, এমন একটা অবস্থা মিল্কভিটা দুধ নিচ্ছে না, হাঁট বাজারের হোটেলগুলোও বন্ধ।  এমন কোন ব্যবস্থা নেই যে দুধগুলো আমরা সংরক্ষণ করবো। এভাবে দুধ বিক্রি বন্ধ থাকলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আমরা খামারিরা মাঠে মারা যাবো। আমরা চাই সরকার এ বিষয়ে দ্রæত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। 
ওই এলাকার দুগ্ধ খামারি কাজল রেখা বলেন, মিল্কভিটা দুধ নিচ্ছে না, বাজারেও তেমন একটা বিক্রি করা যাচ্ছে না। প্রতিটি খামারে প্রতিদিন ৪০ লিটার থেকে শুরু করে ১০০ লিটার পর্যন্ত দুধ হয়। এই দুধ আমরা না পারছি সংরক্ষণ করতে না পারছি বিক্রি করতে। গরুর খাবারের টাকাটাও জোগার করা যাচ্ছে না। এই খামারের উপর নির্ভরশীল আমরা কঠিন সংকটে পড়ে গেছি। এই পরিস্থিতিতে খামারিদের কথা চিন্তা করে সরকারকে দ্রæত প্রদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছি। 
পঞ্চগড় সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বলেন, মিল্কভিটা দুধ কেনা বন্ধ করে দেয়ায় পঞ্চগড়ের খামারিরা দুর্ভোগে পড়েছেন। আমরা খামারিদের কথা চিন্তা করে মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষকে দুধ কেনার অনুরোধ জানিয়েছি। তারা কয়েকদিনের মধ্যে স্বল্প পরিসরে হলেও দুুধ কেনার বিষয়ে আমাদের আশ^স্ত করেছেন। 
পঞ্চগড় মিল্কভিটা দুগ্ধ কারখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. এ এস এম রাশেদ বলেন, খামারিদের দাবির কথা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সেখান থেকে দুধ কেনার বিষয়ে আমরা এখনো কোন নির্দেশনা পাইনি। তবে আমাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। যে কোন সময় দুধ কেনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।